প্রযুক্তির অদম্য গতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ‘ডিপফেইক’ এখন এতটাই নিখুঁত যে সাধারণ চোখে আসল ও নকলের পার্থক্য বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আশার কথা হলো, মানুষের সচেতনতা ও সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এখনো ডিপফেইক ধরে ফেলা সম্ভব।  মাত্র এক ঘণ্টার প্রশিক্ষণেই মানুষের ডিপফেইক শনাক্ত করার সক্ষমতা ৪০ থেকে ৮০ শতাংশে বেড়ে যায় …

 

এআই অ্যালগরিদম যেসব মুখমণ্ডল তৈরি করে, সেগুলো সাধারণত অস্বাভাবিক মাত্রায় নিখুঁত, সুন্দর এবং পরিপাটি হয়ে থাকে …

এআই সচরাচর সাধারণ গড়নের মুখ তৈরি করে, ফলে ভিড়ের মাঝে ওই মুখকে আলাদা করার মতো কোনো বিশেষত্ব থাকে না …

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি বা ‘ডিপফেইক’ দিনদিন এতটাই নিখুঁত হয়ে উঠছে যে, সাধারণ চোখে সত্য-মিথ্যা পরখ করা কঠিন। কিন্তু মানুষের কি এআই দিয়ে তৈরি ছবি শনাক্ত সম্ভব? অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যলয়ের গবেষক ড. ক্লেয়ার সাদারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইমোশনস অ্যান্ড ফেসেস ল্যাব’-এর পরিচালক অধ্যাপক অ্যা ড্রয়েলের যৌথ এক গবেষণায় এ প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর মিলেছে। পূর্বে এআই-এর ভুলত্রুটি, যেমন হাতে ছয়টি আঙুল থাকা বা কানফুলের অদ্ভুত গঠন দেখে সহজেই ভুয়া ছবি ধরা যেত। তবে প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত নিজের ভুল শুধরে উন্নত হচ্ছে। গবেষকরা জানান, এখন একক ভুল বা নির্দিষ্ট লক্ষণের ওপর নির্ভর না করে মানুষের মুখের ছয়টি সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য বা অনুভূতির ওপর নজর দিলে ডিপফেইক ছবি ধরা সহজ হয়ে যায়-

 

১. সামঞ্জস্যতা বা সিমেট্রি (Symmetry)

প্রাকৃতিক মানুষের মুখে কিছু না কিছু অসামঞ্জস্যতা থাকে; যেমন হালকা হেলে থাকা চোখের পাতা বা সামান্য বাঁকা হাসি। কিন্তু এআই-এর তৈরি মুখমণ্ডলগুলো অতিরিক্ত নিখুঁত বা পরিপাটি হয়। চেহারা যদি ‘প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিখুঁত’ মনে হয়, তবে সেটি ভুয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

 

২. অনুপাত (Proportionality)

এআই-এর তৈরি ডিপফেইক ছবিতে সচরাচর অত্যন্ত বড় নাক কিংবা অস্বাভাবিক বের হয়ে থাকা কানের মতো বৈশিষ্ট্যগুলো খুব একটা দেখা যায় না। তারা গড়পড়তা চেহারার অনুপাত বজায় রাখার চেষ্টা করে।

৩. আকর্ষণীয়তা (Attractiveness)

গবেষকদের মতে, এআই সাধারণত সাধারণ মানুষের তুলনায় খানিকটা বেশি সুন্দর বা আকর্ষণীয় দেখতে এমন মুখশ্রী বা মুখমণ্ডল তৈরি করার দিকে ঝুঁঁকিয়ে থাকে।

৪. স্বাতন্ত্র্যহীনতা (Distinctiveness)

ভিড়ের মাঝে একজন মানুষকে আলাদা করে চেনার মতো কোনো বিশেষত্ব এআই চেহারায় কম থাকে। এসব মুখমণ্ডল দেখতে অনেকটাই সাধারণ বা গড়ের কাছাকাছি হয়।

৫. অভিব্যক্তির অভাব (Expressiveness)

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি চেহারায় মানুষের ভেতরের আবেগের বা অনুভূতির প্রকাশ কম ঘটে। এআই দিয়ে তৈরি মুখগুলোতে আবেগপ্রবণ অভিব্যক্তির ঘাটতি থাকে।

৬. মনে রাখার অভিজ্ঞতা (Memorability)

সাধারণ চেহারার হওয়ায় এআই-এর তৈরি ছবিগুলো সহজে মনে রাখা কঠিন হয়।

 

এ ছাড়াও এআই অ্যালগরিদম তুলনামূলকভাবে কম বয়সি এবং শ্বেতাঙ্গদের ছবিতে বেশি অভ্যস্ত হওয়ায় অ-শ্বেতাঙ্গ কিংবা বয়স্কদের ছবি তৈরিতে এখনো দুর্বল। গবেষণায় দেখা গেছে, এক ঘণ্টার ব্যবধানে আসল ও এআই ছবির পার্থক্য দেখিয়ে দিলে মানুষের ছবি চেনার নির্ভুলতার হার ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮০ শতাংশ পৌঁছে যায়।

 

এআই ডিপ ফেইক চেনা কেন জরুরি?

এআই ডিপফেইকের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো আন্তর্জাতিক প্রতারণা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। বৈশ্বিক আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেলয়েটের (Deloitte)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে এআই ডিপফেইক জালিয়াতির মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি হংকংয়ের একটি প্রতিষ্ঠানে বসের ভুয়া ডিপফেইক ভিডিওকলের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৯ সালে ‘কেটি জোন্স’ নামের একজন রুশ বিশেষজ্ঞের ডিপফেইক প্রোফাইল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছিল। তবে প্রযুক্তির সবটুকুই ক্ষতিকর নয়। ড. সাদারল্যান্ডের মতে, হারিয়ে যাওয়া শিশুদের বয়স বাড়লে কেমন দেখাবে তা স্বল্প খরচে তৈরি করতে বা সৃজনশীল কাজে এআইয়ের ইতিবাচক ব্যবহার রয়েছে। তবে মূল বিষয় হলো-বিশ্ব এখনো পুরোপুরি ডিপফেইকের কাছে হার মানেনি; সামান্য সচেতনতা ও নজরদারিই পারে আসল ও নকলের পার্থক্য গড়ে দিতে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *