কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ ভাইরাসের জিনোম নকশা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের মতে, এই অগ্রগতি ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে একই সঙ্গে এ প্রযুক্তির অপব্যবহার ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণায় তৈরি ভাইরাসগুলো ‘ব্যাকটেরিওফেজ’ বা সংক্ষেপে ‘ফেইজ’ নামে পরিচিত। এসব ভাইরাস কেবল ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াজনিত দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ড. ব্রায়ান হাইয়ের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। জিনোম-সংক্রান্ত বিপুল তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত বিশেষ এআই মডেল ব্যবহার করে গবেষকরা নতুন ব্যাকটেরিওফেজের জিনোম তৈরি করেন। গবেষণায় ‘ইভো-১’ ও ‘ইভো-২’ নামের দুটি এআই মডেল ব্যবহার করা হয়। প্রায় ২০ লাখ ব্যাকটেরিওফেজের জিনগত তথ্য দিয়ে মডেল দুটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তবে মানুষ, প্রাণী বা উদ্ভিদকে আক্রান্ত করতে পারে এমন ভাইরাসের জেনেটিক তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে প্রশিক্ষণ ডেটার বাইরে রাখা হয়, যাতে বিপজ্জনক ভাইরাস তৈরির ঝুঁকি কমানো যায়। এআই মডেলগুলো পরীক্ষার সময় হাজার হাজার সম্ভাব্য ভাইরাসের জিনোম তৈরি করে। সেখান থেকে গবেষকরা ল্যাবে তৈরির জন্য প্রায় ৩০০টি নকশা বেছে নেন। এসব কৃত্রিম জিনোম ব্যাকটেরিয়ার কোষে প্রবেশ করানো হলে সেগুলোর জেনেটিক কোড ব্যবহার করে নতুন ব্যাকটেরিওফেজ তৈরি হতে শুরু করে। তবে সব নকশা সফল হয়নি। ৩০০টি কৃত্রিম জিনোমের মধ্যে মাত্র ১৬টি কার্যকর ব্যাকটেরিওফেজ হিসেবে টিকে থাকতে সক্ষম হয়। পরে এসব ফেইজের একটি মিশ্রণ বা ‘ককটেল’ দিয়ে বিশেষ ধরনের ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে পরীক্ষা চালানো হয়। গবেষকদের দাবি, এই ককটেল ই-কোলাইয়ের দুটি ভিন্ন প্রজাতির প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে এমন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও এটি কার্যকর হয়েছে, যেগুলো সাধারণ বা প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিওফেজ প্রতিরোধ করতে পারে। গবেষণাটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, দ্রুত জিনোম নকশা তৈরি করে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সেগুলো কার্যকর করার সক্ষমতা ভবিষ্যতে ফেইজ থেরাপিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে এবং জীবপ্রযুক্তির কাজের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি গবেষকরা বায়ো-সেইফটি, বায়ো-কন্টেইনমেন্ট ও বায়ো-সিকিউরিটি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, পূর্ণাঙ্গ জিনোম নকশা করার সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় গবেষণার পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ চালিয়ে যাওয়া জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির অধ্যাপক টম ইঙ্গলসবি ও ড. মরিৎজ হাঙ্কে এক সহযোগী নিবন্ধে সতর্ক করে বলেন, জীববিজ্ঞানে জেনারেটিভ এআইয়ের প্রয়োগ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও এর সঙ্গে জরুরি বায়ো-সেইফটি ও বায়ো-সিকিউরিটির প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। তাদের মতে, জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে ভাইরাসের জিনোম তৈরি করার সক্ষমতা এখন বাস্তবতা। কিন্তু এই প্রযুক্তিকে নিরাপদভাবে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। গবেষকরা বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন, একই ধরনের প্রযুক্তি যদি মানুষ, প্রাণী বা উদ্ভিদকে আক্রান্ত করতে পারে এমন রোগজীবাণুর জেনেটিক কোড নিয়ে ব্যবহার করা হয়, তাহলে নতুন ও আরও বিপজ্জনক রোগজীবাণু তৈরির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সিন্থেটিক জিনোম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক টম এলিস বলেন, এটি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিস্ময়কর অর্জন হলেও গবেষণায় যে জিনোম নিয়ে কাজ করা হয়েছে, সেটি তুলনামূলকভাবে ছোট ও সহজ। ভবিষ্যতে বিপজ্জনক রোগজীবাণুর জেনেটিক তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত এআই আরও ক্ষতিকর ভাইরাসের নকশা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। তবে জেনেটিক তথ্যের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জিনোম তৈরির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে এসব ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করেন এলিস। গবেষকদের এই সাফল্য একদিকে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে জীববিজ্ঞানে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। Post navigation নতুন বিতর্কের জন্ম দিল এআই পুরোনো ইউএসবি ড্রাইভ ফেলে দেওয়ার আগে যা করবেন