বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া নিয়ে যেভাবে মানবপাচার করেন ‘ইউরো আশিকরা’ - Amader Bangladesh

নিজস্ব প্রতিবেদক :  র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব-৮) অভিযানে ঢাকা ও তার পাশের দুই জেলা থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে মানবপাচার আন্তর্জাতিক চক্রের বাংলাদেশি এজেন্ট ‘রুবেল সিন্ডিকেট’র প্রধান সমন্বয়ক ‘ইউরো আশিক’সহ ৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর কাওরানবাজার বাজারে র‌্যাব’র মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বাহিনীর লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং‘র পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

রাজধানীসহ মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ থেকে রুবেল সিন্ডিকেট’র সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধভাবে ইউরোপ গমনের ক্ষেত্রে ভূমধ্যসাগরের নৌপথ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সিন্ডিকেট এই অবৈধ গমনাগমনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে মাঝে মধ্যেই দূর্ঘটনা, প্রাণহানী ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। অতিসম্প্রতি, গত ২৮-২৯ জুন অবৈধভাবে ইউরোপে গমনকালে ভূমধ্যসাগরের তিউনেশিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে প্রায় ৪৩ জন নিহত-নিখোঁজ হয়।

র‌্যাব’র লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং’র এ পরিচালক আরও জানান, তিউনিসার উপকূল থেকে বিধ্বস্ত নৌকা থেকে ৮৪ জনকে উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ, সুদান, মিশর, ইরিত্রিয়া ও চাঁদের নাগরিক রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। আজও ৪৯ বাংলাদেশি উদ্ধারের সংবাদ জানা গেছে। এ সকল ঘটনাসমূহের আলোকে র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে। যার ধারাবাহিকতায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল শনিবার রাত থেকে আজ রোববার সকাল পর্যন্ত র‌্যাব সদরদপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-৮’র যৌথ অভিযানে মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মো. আশিক (২৫), মো. আজিজুল হক (৩৫), মো. মিজানুর রহমান মিজান (৪৩), নাজমুল হুদা (৩১), সিমা আক্তার (২৩), হেলেনা বেগম (৪২), এবং পলি আক্তার (৪৩)। তাদের কাছ থেকে ১৭টি পাসপোর্ট, ১৪টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই, ২টি এটিএম কার্ড, ১৫টি বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা জমা প্রদানের বই, ২টি হিসাব নথি, ২টি এনআইডি, ১০টি মোবাইল ফোন এবং নগদ ৫৬ হাজার ৬৭০ টাকা জব্দ করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‍্যাব জানায়, বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ এই অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন তারা। সংঘবদ্ধ চক্রটি বিদেশি চক্রের যোগসাজসে অবৈধভাবে ইউরোপে মানব পাচার করে আসছে। এই সিন্ডিকেটটি তিনটি ধাপে কাজগুলো করত বলে জানা গেছে।

যেভাবে মানুষ বাছাই করে তারা

র‍্যাব সূত্র জানায়, বিদেশে গমনেচ্ছুদের নির্বাচনকালে এই চক্রের দেশিয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের অল্প আয়ের মানুষদের স্বল্প খরচে উন্নত দেশে গমনের প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে থাকে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। বিদেশে গমনের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকিট ক্রয় ইত্যাদি কার্যাবলী এই সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়ে থাকে। পাসপোর্ট ও অন্যান্য নথিগুলো পাচারচক্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দেয়। পরবর্তীতে তাদেরকে এককালীন বা ধাপে ধাপে টাকা নিয়ে ইউরোপের পথে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রার্থীদের সামর্থ অনুযায়ী ধাপ নির্বাচন করে থাকে। ইউরোপ গমনের ক্ষেত্রে তারা ৭-৮ লাখ টাকার বেশি অর্থ নিয়ে থাকে; এরমধ্যে সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লিবিয়ায় গমনের আগে এবং বাকি আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা লিবিয়ায় গমনের পর ভিকটিমের স্বজনের নিকট থেকে নেয়।

যেভাবে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায়

র‍্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃত সিন্ডিকেটটি বর্তমানে বাংলাদেশ হতে ‘মধ্যপ্রাচ্যের মাধ্যমে লিবিয়া’ রুট ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ থেকে গমনের পর মধ্যপ্রাচ্যে তাদেরকে বিদেশি এজেন্টদের যোগসাজসে ৭-৮ দিন অবস্থান করানো হয়। বেনগাজি (লিবিয়া) আনতে বেনগাজি হতেই এজেন্টরা কথিত ‘মারাকাপা’ নামে একটি ডকুমেন্ট দুবাইতে পাঠিয়ে থাকে। যা লিবিয়াতে যাত্রার আগে দুবাইয়ে অবস্থানরত ইউরোপ গমনাচ্ছুদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে সেসব ডকুমেন্টসহ বিদেশি এজেন্টদের সহায়তায় তাদের বেনগাজিতে পাঠানো হয়। এরপর তাকে বেনগাজি থেকে ত্রিপোলিতে স্থানান্তর করা হয়ে থাকে। পরে তাদেরকে স্বল্প সময়ের মধ্যপ্রাচ্যে ট্রানজিট করিয়ে সরাসরি লিবিয়ায় পাঠানো হয়। এই চক্রের বাংলাদেশি সিন্ডিকেটের সদস্য রুবেল দুবাইতে অবস্থান করে তাদের সব কার্যক্রম মনিটরিং করছে।

লিবিয়া থেকে ইউরোপ যেভাবে

র‍্যাবের সূত্র জানায়, বিদেশ গমনেচ্ছুরা ত্রিপোলিতে পৌঁছানোর পর লিবিয়া এজেন্টদের সহায়তায় ‘গাজী’, ‘কাজী’ ও ‘বাবুল’ নামে তিন বাংলাদেশি তাদের গ্রহণ করে সেখানে তাদের কয়েকদিন অবস্থান করিয়ে থাকে। ত্রিপোলিতে অবস্থানকালীন সিন্ডিকেটটি বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রতিনিধি দ্বারা ইউরোপ গমনাচ্ছুদের আত্বীয়-স্বজন থেকে অর্থ আদায় করে থাকে। এরপর সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছ থেকে অথের্র বিনিময়ে ইউরোপে পাচারের উদ্দেশ্যে গমনেচ্ছুদের হস্তান্তর করা হয়। এই সিন্ডিকেট তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করিয়ে থাকে। এরপর গমনেচ্ছুদের সমুদ্রপথ অতিক্রম করার জন্য নৌযান চালনা এবং দিক নির্ণয়যন্ত্র পরিচালনাসহ আনুসাঙ্গিক বিষয়ের উপর নানাবিধ প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

একটি নির্দিষ্ট দিনের ভোরে একসঙ্গে কয়েকটি নৌযান লিবিয়া হয়ে তিউনেশিয়া উপকূলীয় চ্যানেলের হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে গমনকালে ভিকটিমরা ভূমধ্যসাগরে হরহামেশাই দূর্ঘটনার শিকার হয়। এতে কারও কারও জীবনাবসান হয়ে থাকে। ভূমধ্যসাগরের নৌকায় চড়াকে সিন্ডিকেটের লোকজন ‘গেম’ বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, সেখানে ঝুঁকি আছে, আবার রয়েছে উন্নত জীবনের হাতছানি।

গ্রেপ্তারকৃদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‍্যাব আরও জানায়, ভূমধ্যসাগরের বিগত কয়েকটি নৌকাডুবি ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় নিখোঁজ-নিহত বাংলাদেশিদের রুবেল সিন্ডিকেট পাচার করেছে। চক্রের মাধ্যমে অনেকে অবৈধপথে ইউরোপে গমনাগমন করেছে আবার অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়েছে। এ চক্রের গ্রেপ্তারকৃতরা বাংলাদেশি বলে জানা গেছে।

রুবেল সিন্ডিকেট’র মূল হোতা রুবেল। তিনি দুবাইতে অবস্থান করে অবৈধ পাচার চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছে। রুবেল ২০১২-২০১৭ সাল পর্যন্ত লিবিয়া অবস্থানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সঙ্গে বিশেষ যোগসাজস হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ দূতাবাস, লিবিয়াতে মানবপাচার সংক্রান্ত রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বিধায় তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করে সিন্ডিকেটটি পরিচালনা করছে। রুবেল বাংলাদেশে তার পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে মূল নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করছে।

এ চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে জড়িত রয়েছে রুবেলের স্ত্রী গ্রেপ্তারকৃত সীমা, ভাগনে গ্রেপ্তারকৃত আশিক, দুই বোন যথাক্রমে গ্রেপ্তারকৃত হেলেনা ও পলি। তারা পাসপোর্ট মজুদ, সংগ্রহ ও অর্থ লেনদেনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। রুবেল সিন্ডিকেট’র বাংলাদেশে মানবপাচারকারীর মূল হোতা ও প্রধান সমন্বয়ক গ্রেপ্তারকৃত আশিক। তিনি বাংলাদেশে সিন্ডিকেটটি পরিচালনা করছেন। তিনি এসএসসি পাস, এইচএসসিতে অকৃতকার্য হন। পরবর্তীতে ২ বছর মধ্যপ্রাচ্যে ছিল। ২০১৯ হতে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জে অবস্থান করে অবৈধ মানবপাচারের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন।

জানা গেছে, আশিক মূলত তার মামা রুবেলের কাছ থেকে ভিসা সংগ্রহ করে থাকে। তার মূল দায়িত্ব গমনেচ্ছুদের বাংলাদেশ হতে দুবাই পাঠানো। চক্রটির বাংলাদেশি সিন্ডিকেটে প্রায় ২৫ জন সদস্য আছে। চক্রটি বিগত প্রায় দুবছর যাবৎ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে গ্রেপ্তারকৃতরা জানান। বাংলাদেশের মাদারীপুর, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর ইত্যাদি এলাকায় চক্রটি বিশেষভাবে সক্রিয়। এ ছাড়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে তাদের এজেন্ট রয়েছে বলে জানায় গ্রেপ্তারকৃতরা।

সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মানবপাচার বিরোধী অভিযান বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই চক্রটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাসপোর্ট বহনের ক্ষেত্রে কৌশলগত কারণে সাধারণত কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে থাকে। এই সিন্ডিকেট সদস্যদের বিভিন্ন ব্যাংকে বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট আছে বলে জানা যায়। এ ছাড়া কয়েকজনের মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসা রয়েছে।